শ্রদ্ধা-ভক্তি-বিশ্বাসের অটুট বন্ধনে আজও পূজিত শ্যামাপ্রসাদ, প্রতিদিন পুজো করে দিন শুরু করেন ৭৯ বছরের শ্যামসুন্দর

শ্রদ্ধা-ভক্তি-বিশ্বাসের অটুট বন্ধনে আজও পূজিত শ্যামাপ্রসাদ, প্রতিদিন পুজো করে দিন শুরু করেন ৭৯ বছরের শ্যামসুন্দর

Reported BY:- অভিজিৎ হাজরা, আমতা, হাওড়া

শ্রদ্ধা, ভক্তি আর বিশ্বাসের এক অনন্য সম্পর্ক। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে শ্বেতশুভ্র পোশাক পরে মালা, ফুল ও ধূপ নিয়ে নিজের মা-বাবার প্রতিকৃতির পাশে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি রেখে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুজো করেন ৭৯ বছর বয়সি শ্যামসুন্দর সাঁতরা। তাঁর কাছে শ্যামাপ্রসাদ শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি জীবনের পথপ্রদর্শক এবং এক আবেগের নাম।

হাওড়ার আমতা থানার কুশবেড়িয়া-তাজপুর ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শ্যামসুন্দর সাঁতরার কথায়, তাঁর জীবনে শ্যামাপ্রসাদের আদর্শ, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ গভীর প্রভাব ফেলেছে।

১৯৪৭ সালের ১০ এপ্রিল, কুশবেড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের পানশিলা গ্রামে জন্ম শ্যামসুন্দর সাঁতরার। বাবা কানাইলাল সাঁতরা ও মা কমলাবালা দেবী। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। পানশিলা শীতলচক বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করার পর বাইনান বামনদাস স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এই সময় তাঁর যোগাযোগ হয় তাজপুরের সমাজসেবী ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অনুগামী প্রসাদ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তাঁর উদ্যোগে তাজপুরের শিক্ষণ শিবিরে বিনামূল্যে থেকে পড়াশোনার সুযোগ পান শ্যামসুন্দর। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তাঁর পড়াশোনার সমস্ত খরচ বহন করে ওই শিবির।

প্রসাদ চক্রবর্তী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং বাংলার প্রতি তাঁর ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। ধীরে ধীরে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর কাছে হয়ে ওঠেন জীবনের অন্যতম আদর্শ।

পরে আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কীর্তন দলে যোগ দেন শ্যামসুন্দর। কীর্তন দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নিরামিষ আহার শুরু করেন এবং আজও সেই অভ্যাস বজায় রেখেছেন। হাওড়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলার গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিন ধরে কীর্তন পরিবেশন করেছেন তিনি।

সমাজসেবার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক জীবনও দীর্ঘ। ১৯৭১ সালে জনসংঘে যোগদান এবং ১৯৮০ সালে বিজেপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কুশবেড়িয়া, তাজপুর ও ঝামটিয়া এলাকায় জনসংঘের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিজেপির সংগঠনও ওই এলাকায় বিস্তার লাভ করে। ২০২৩ সালে সারদা গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন শ্যামসুন্দর সাঁতরা।

শ্যামসুন্দর সাঁতরার দাবি, বাম আমলেও পানশিলা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং এখনও সেই সাংগঠনিক ভিত্তি বজায় রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার কেন্দ্রে এখনও জনসংঘ ও বিজেপির আদর্শ।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্যামসুন্দর সাঁতরা তাঁকে শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, রাষ্ট্রনায়ক, সংগঠক এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা এবং আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে বলেও মত তাঁর।

শ্যামসুন্দরের কথায়, “মানুষ মরে যায়, কিন্তু মহান আদর্শ কখনও মরে না।” তাঁর কাছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভগবানের মতো। প্রতিদিন তাঁর প্রতিকৃতির সামনে পুজো করার মধ্য দিয়ে নিজের দিনের কাজ শুরু করেন তিনি।

রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন শ্যামসুন্দর। তাঁর বিশ্বাস, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর জীবদ্দশায় যা সম্পূর্ণ হয়নি, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে বিজেপি সরকার।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও ঐতিহাসিক দাবিগুলি শ্যামসুন্দর সাঁতরার নিজস্ব মতামত ও বিশ্বাস হিসেবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত আস্থা এবং ধর্মীয় শ্রদ্ধার মেলবন্ধনে প্রতিদিন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পুজো করে চলেছেন আমতার এই প্রবীণ মানুষটি।

Leave a Reply

Translate »