ডায়াবেটিস রোগীদের জরুরি ভ্যাকসিন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা—জানালেন ডিসান হাসপাতালের ডা. অমিতাভ সাহা

ডায়াবেটিস রোগীদের জরুরি ভ্যাকসিন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসা—জানালেন ডিসান হাসপাতালের ডা. অমিতাভ সাহা

নিজস্ব প্রতিবেদন:

ICMR–INDIAB–এর সর্বশেষ সমীক্ষা জানাচ্ছে, বর্তমানে ভারতে প্রায় ১০১ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ১৩৪ মিলিয়নে পৌঁছাবে। ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতা বজায় রাখলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা রোধ করা সম্ভব। এমনটাই জানালেন ডিসান হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিনের অধিকর্তা ও ইন্টারনাল মেডিসিনের সিনিয়র কনসাল্ট্যান্ট ডা. অমিতাভ সাহা

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কোন কোন ভ্যাকসিন জরুরি

ডা. সাহার কথায়, ডায়াবেটিসে রোগ–প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হারপেস জোস্টার ও হেপাটাইটিস–বি–র মতো সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (ADA, CDC) অনুযায়ী তিনি ডায়াবেটিস রোগীদের নিম্নলিখিত ভ্যাকসিনগুলো নেওয়ার পরামর্শ দেন—

  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: প্রতি বছর নিতে হবে। ৫০ বছরের বেশি ডায়াবেটিকদের নিউমোনিয়া–ঝুঁকি কমায়।

  • নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন: PCV20 একবার অথবা PCV13 + PPSV23 (এক বছর পর)।

  • হেপাটাইটিস–বি: ১৯–৫৯ বছর বয়সীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি; ৬০+ বয়সেও ঝুঁকি থাকলে দেওয়া যায়।

  • হারপেস জোস্টার (Shingrix): ৫০ বছরের বেশি ডায়াবেটিকদের ২ ডোজ নিতে হবে।

  • কোভিড–১৯ বুস্টার: বয়স ও কোমর্বিডিটি অনুযায়ী।

ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত যেসব পরীক্ষা করানো উচিত

 

ডা. সাহা জানান, ডায়াবেটিস কেবল রক্তে শর্করার মাত্রাই বাড়ায় না; নীরবে চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালীতেও ক্ষতি করে। তাই নিয়মিত কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

প্রতি ৩ মাসে:
– HbA1c
– Fasting ও PP গ্লুকোজ

প্রতি ৬–১২ মাসে:
– Kidney function (Creatinine, eGFR, UACR)
– Lipid profile (LDL < 70 mg/dL লক্ষ্যমাত্রা)
– LFT
– TSH

প্রতি বছর:
– রেটিনা পরীক্ষা
– পায়ের স্নায়ু পরীক্ষা
– ECG ও কার্ডিয়াক রিস্ক মূল্যায়ন
– ডেন্টাল চেক-আপ

 

প্রয়োজন হলে CGM, Stress Test, Echo এবং Vitamin D/B12–এর মাত্রাও পরীক্ষা করতে বলেন তিনি।

পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (PAD) প্রতিরোধে করণীয়

ডা. সাহা জানান, PAD–এর অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপ্রবণ অবস্থা হলো ডায়াবেটিস। এটি পায়ে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে ব্যথা, ক্লডিকেশন এমনকি গ্যাংগ্রিনের ঝুঁকি বাড়ায়। এ জন্য যা জরুরি—

  • রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ (HbA1c 6.5–7%)

  • রক্তচাপ <130/80 mmHg

  • LDL < 70 mg/dL

  • সম্পূর্ণ ধূমপান পরিত্যাগ

  • নিয়মিত হাঁটা

  • ABI বা ডপলার পরীক্ষা (প্রয়োজনে)

সেমাগ্লুটাইড কারা নেবেন, কারা নেবেন না

সেমাগ্লুটাইড (GLP-1 RA) বর্তমানে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর ওজন–কমানো, সুগার–কন্ট্রোল ও কার্ডিওভাসকুলার সুরক্ষার জন্য পরিচিত। তবে এটি সব রোগীর জন্য নয়।

যাদের জন্য উপযোগী:
– টাইপ ২ ডায়াবেটিস
– BMI > 27
– অতিরিক্ত ওজন
– কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি বেশি
– মেটফর্মিন বা অন্যান্য ওষুধে নিয়ন্ত্রণ না হলে

যাদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা:
– টাইপ ১ ডায়াবেটিস
– গর্ভবতী/স্তন্যদানরত
– Medullary Thyroid Carcinoma ইতিহাস
– Pancreatitis ইতিহাস
– গুরুতর GI সমস্যা

শেষ কথা

 

ডা. সাহার মতে, “ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা এখন শুধুমাত্র সুগার কন্ট্রোল নয়—এটি ভ্যাকসিনেশন, অঙ্গ–সুরক্ষা, রক্তনালীর পরিচর্যা এবং আধুনিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া। সময়মতো পরীক্ষা ও সচেতনতা একজন ডায়াবেটিক রোগীর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।”

Leave a Reply

Translate »