লিভার সুস্থ রাখতে প্যারাসিটামল খাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ জরুরি: বিশেষজ্ঞ

লিভার সুস্থ রাখতে প্যারাসিটামল খাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ জরুরি: বিশেষজ্ঞ

News desk

কলকাতা:
জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা গা-হাত-পা ব্যথায় প্যারাসিটামল সাধারণত নিরাপদ ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং মাত্রাতিরিক্ত প্যারাসিটামল সেবন করলে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে—এমনই সতর্কবার্তা দিলেন ডিসান হাসপাতালের গ্যাসট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুনীলবরণ দাস চক্রবর্তী।

তিনি জানান, প্যারাসিটামল সাধারণ অবস্থায় নিরাপদ হলেও ‘মুড়িমুড়কির মতো’ এই ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস লিভারের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত মদ্যপান করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা বা জ্বরের সময় প্যারাসিটামল গ্রহণ লিভারের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালকোহল ও প্যারাসিটামল একসঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে লিভারে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে লিভার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় হেপাটোটক্সিসিটি
ব্রিটিশ জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজিতে প্রকাশিত গবেষণাতেও এই তথ্য উঠে এসেছে।

ডা. সুনীলবরণ জানান, আমাদের দেশে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বহু রোগীর অসুস্থতার পেছনে অন্যতম কারণ নির্ধারিত মাত্রার বাইরে প্যারাসিটামল গ্রহণ। বিশেষ করে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর দুর্বলতা বা মাথাব্যথা কাটাতে অনেকে নিজের ইচ্ছেমতো প্যারাসিটামল খান, যা দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

লিভার মানবদেহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্ব-মেরামতক্ষম অঙ্গ। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতি হলেও লিভার নিজে থেকেই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নিয়মিত মদ্যপান ও লাগাতার প্যারাসিটামল সেবনে এই অঙ্গের কোষ নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে। এর ফলে লিভারের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন লিভার এনজাইমের মাত্রায় তারতম্য দেখা যায়।

 

সমস্যার শুরুতে লিভারের অসুখে তেমন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ না থাকায় রোগীরা বিষয়টি বুঝতে পারেন না। পরে খাবারে অরুচি, ওজন কমে যাওয়া, বমিভাব, দুর্বলতা, মাথা ঝিমঝিম করা, কাজকর্মে অনীহা—এই উপসর্গগুলি দেখা দিলে ততদিনে লিভারের ক্ষতি অনেকটাই হয়ে যায়।

লিভারের অবস্থা জানতে লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) করা হয়। এই পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে অ্যালবুমিন, AST, ALT, ALP, টোটাল বিলিরুবিন ইত্যাদি। প্রয়োজনে ফাইব্রোস্ক্যান পরীক্ষাও করা হতে পারে। এটি একটি ব্যথাহীন আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা, যার মাধ্যমে লিভারের ফাইব্রোসিস ও ফ্যাট জমার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস, অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগ এবং সিরোসিস নির্ণয়ে এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন কোনও ওষুধ নিয়মিত সেবনের প্রয়োজন হলে অবশ্যই সময়মতো লিভার এনজাইম পরীক্ষা করানো উচিত। বর্তমানে উৎসব বা সামাজিক উপলক্ষে মদ্যপানের প্রবণতা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের পর প্যারাসিটামল খেলে লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়—বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই লিভারের সমস্যা রয়েছে।

 

সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
সুস্থ থাকতে মদ্যপানে রাশ টানুন এবং সেলফ মেডিকেশন থেকে দূরে থাকুন। জ্বর বা ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ মেনেই প্যারাসিটামল গ্রহণ করুন।

Leave a Reply

Translate »